আমরা প্রায়ই বলি—
দেশটা বদলে যাচ্ছে।
কেউ বলে ভালো দিকে, কেউ বলে খারাপ দিকে।
কিন্তু এই বদলে যাওয়ার ভেতরে একটি নীরব প্রশ্ন লুকিয়ে থাকে—
আমরা কেমন মানুষ হয়ে উঠছি?
রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে, অফিসে কাজ করতে করতে, সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে পাঠাতে—
অনেকেই ভেতরে ভেতরে একটা অস্বস্তি অনুভব করি।
সব ঠিকঠাক চলছে মনে হয় না।
এই অস্বস্তির নামই হয়তো
সুনাগরিক সংকট।
এটা হঠাৎ তৈরি হয়নি।
এটা কোনো একক ঘটনার ফলও নয়।
এটা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এক বাস্তবতা—
আমার, আপনার, আমাদের সম্মিলিত জীবনের ভেতর দিয়ে।
আমরা খারাপ মানুষ নই, কিন্তু ক্লান্ত মানুষ
এই কথা বলা দরকার—
আমরা খারাপ মানুষ নই।
আমরা পরিশ্রম করি, স্বপ্ন দেখি, পরিবার নিয়ে বাঁচতে চাই।
তবু কোথাও যেন দায়িত্ববোধটা ক্ষয়ে যাচ্ছে।
একজন মানুষ জানেন—লাইন ভাঙা ঠিক নয়,
তবু তাড়াহুড়ার অজুহাতে তিনি সামনে এগিয়ে যান।
একজন অভিভাবক বোঝেন—মিথ্যা বলা শেখানো ঠিক নয়,
তবু “এভাবে না বললে কাজ হবে না” বলে সন্তানকে ভুল শিক্ষা দেন।
এই মানুষগুলো নৈতিকতা চায় না—এমন নয়।
তারা শুধু ক্লান্ত।
একটি কঠিন বাস্তবতার সাথে মানিয়ে নিতে গিয়ে
ধীরে ধীরে আপস করতে শিখে গেছে।
এখানেই শুরু হয় সুনাগরিক সংকট।
নাগরিকত্ব কাগজে আছে, চরিত্রে কম
আমরা নাগরিক—জাতীয় পরিচয়পত্র আছে, ভোটাধিকার আছে।
কিন্তু নাগরিকত্ব কি শুধু কাগজের ব্যাপার?
সুনাগরিক মানে এমন একজন মানুষ,
যিনি নিজের অধিকার যেমন বোঝেন,
তেমনি দায়িত্বও অনুভব করেন।
আজকের বাস্তবতায় আমরা অধিকার নিয়ে খুব সচেতন।
কিন্তু দায়িত্বের জায়গায় এসে অনেক সময় চুপ থাকি।
রাস্তার ময়লা অন্য কেউ পরিষ্কার করবে—
এই ভাবনায় আমরা নিজের হাতে ময়লা ফেলি।
দুর্নীতি “উপরে উপরে”—
এই অজুহাতে আমরা নিজের ছোট অন্যায়কে হালকা করি।
ইসলাম এই জায়গায় খুব বাস্তববাদী।
ইসলাম মানুষকে ফেরেশতা বানাতে চায় না।
কিন্তু ইসলাম মানুষকে দায়িত্বহীন থাকতে দেয় না।
আধুনিকতা কি আমাদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?
আজকের বাংলাদেশ দ্রুত বদলাচ্ছে।
প্রযুক্তি এসেছে, সুযোগ এসেছে, গতিও বেড়েছে।
কিন্তু এই দ্রুততার ভেতরে
আমরা কি মানুষ হিসেবে একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি?
একসময় পাড়া ছিল—
এখন শুধু ফ্ল্যাট।
একসময় বড়রা বকতেন,
এখন সবাই ব্যস্ত।
একসময় লজ্জা ছিল সামাজিক নিয়ন্ত্রণ,
এখন “কে দেখছে” সেটাই মাপকাঠি।
এই পরিবর্তনগুলো ভালো না খারাপ—
এই বিতর্কে যাওয়ার দরকার নেই।
কিন্তু প্রশ্ন একটাই—
এই পরিবর্তনের ভেতরে
আমরা কি সুনাগরিক হওয়ার জায়গাটা হারিয়ে ফেলছি?
ইসলামি দৃষ্টিতে সুনাগরিকত্ব
ইসলাম সুনাগরিকত্বকে আলাদা কোনো অধ্যায় হিসেবে দেখে না।
এটা ঈমানেরই একটি প্রকাশ।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
এই হাদিস কোনো রাষ্ট্রীয় ঘোষণা নয়।
এটা ব্যক্তিগত জীবনের জন্য।
ইসলামে সুনাগরিক মানে—
- সত্যবাদী হওয়া
- আমানত রক্ষা করা
- দুর্বলকে সম্মান করা
- অন্যায়ের সাথে আপস না করা
- নিজের ভুল স্বীকার করতে পারা
এই গুণগুলো হারিয়ে গেলে
রাষ্ট্র শক্তিশালী হলেও সমাজ দুর্বল হয়ে পড়ে।
নীরব কষ্ট: কেউ কথা বলে না, কিন্তু সবাই টের পায়
একজন শিক্ষক বুঝতে পারেন—
শিক্ষার্থীরা শুধু নম্বরের পেছনে ছুটছে,
মানুষ হওয়ার শিক্ষা কম পাচ্ছে।
একজন ইমাম অনুভব করেন—
খুতবা শোনা হয়, কিন্তু জীবনে আনা হয় না।
একজন তরুণ মনে মনে কষ্ট পায়—
সততা নিয়ে বাঁচা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
এই কষ্টগুলো কেউ মিটিংয়ে তোলে না।
কেউ পোস্টার বানায় না।
কিন্তু এই নীরব কষ্টই বলে দেয়—
আমরা কোথাও ভুল পথে হাঁটছি।
করণীয়: বড় কিছু নয়, সত্য কিছু
সুনাগরিক সংকট সমাধানের জন্য
আমাদের বিপ্লব লাগবে না।
আমাদের দরকার
সততা, ধারাবাহিকতা আর সাহস।
করণীয় শুরু হয় খুব ছোট জায়গা থেকে—
- নিজের কাজটা ঠিকভাবে করা
- সন্তানকে শুধু সফল নয়, সৎ হতে শেখানো
- অন্যায় দেখলে নীরবে সরে না গিয়ে, অন্তত সমর্থন না দেওয়া
- ধর্মকে শুধু আনুষ্ঠানিকতায় নয়, আচরণে আনা
ইসলাম এখানেই সবচেয়ে বাস্তব।
কারণ ইসলাম বড় দাবি নয়,
ছোট ছোট আমলকে গুরুত্ব দেয়।
আত্মসমালোচনার সাহস
এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে দোষী বানানো নয়।
আমরা সবাই এই সংকটের অংশ।
প্রশ্নটা শুধু—
আমরা কি এটাকে স্বাভাবিক ধরে নিচ্ছি?
আমি কি বলছি—
“সবাই তো এমন”?
এই “সবাই” শব্দটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
কারণ এখানেই দায়িত্ব হারিয়ে যায়।
ইসলাম আমাদের এই জায়গায় থামিয়ে দেয়—
নিজেকে প্রশ্ন করতে শেখায়।
আশার জায়গা এখনো আছে
সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি।
বাংলাদেশ এখনো সম্ভাবনাময়।
এখনো এমন মানুষ আছে—
যারা চাপ সত্ত্বেও সৎ থাকে,
যারা চুপচাপ ভালো কাজ করে,
যারা সন্তানকে মানুষ বানাতে চায়।
এই মানুষগুলোর সংখ্যাই
ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
শেষ কথা
আধুনিক বাংলাদেশে সুনাগরিক সংকট
কোনো একদিনে তৈরি হয়নি।
তাই একদিনেই শেষও হবে না।
কিন্তু পরিবর্তন শুরু হতে পারে আজই—
আমার থেকে, আপনার থেকে।
হয়তো এই লেখার কোনো অংশে
আপনি নিজের জীবনের ছায়া দেখেছেন।
এই দেখাটাই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ সুনাগরিক হওয়া
কোনো পরিচয় নয়—
এটা প্রতিদিনের একটি সিদ্ধান্ত।
নীরবে, দৃঢ়ভাবে, আল্লাহর উপর ভরসা রেখে।