কেন নীরব দর্শক না হয়ে দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়া জরুরি
আমরা অনেক কিছু দেখি।
দেখি অন্যায়, অবহেলা, অবিচার।
দেখি দুর্বল মানুষ চাপা পড়ে যাচ্ছে,
দেখি নিয়ম ভাঙা যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
কিন্তু আমরা বেশিরভাগ সময় কিছু বলি না।
কিছু করি না।
নিজেদের বোঝাই—
“আমার একার দ্বারা কী হবে?”
“সবাই তো করে।”
“ঝামেলায় জড়ানোর দরকার কী?”
এই ভাবনাগুলো খুব মানবিক।
এগুলো কাপুরুষতার নয়,
বরং ক্লান্ত মানুষের আত্মরক্ষার ভাষা।
কিন্তু এখানেই এক ধরনের নীরব কষ্ট জমতে থাকে—
আমরা জানি কিছু ভুল হচ্ছে,
তবু আমরা নীরব থাকছি।
এই নীরবতাই ধীরে ধীরে আমাদের সমাজের স্বাভাবিক রূপ হয়ে যায়।
নীরবতা সব সময় নির্দোষ নয়
নীরব থাকা সব সময় অন্যায়ের সমর্থন নয়—এটা সত্য।
কিন্তু দীর্ঘদিনের নীরবতা কখনো কখনো অন্যায়কে শক্তিশালী করে।
একজন পথচারী দেখেন—
রাস্তায় একজন দুর্বল মানুষকে অপমান করা হচ্ছে।
তিনি এগিয়ে যান না, শুধু পাশ কাটিয়ে চলে যান।
একজন অফিসকর্মী জানেন—
একটি সিদ্ধান্ত অন্যায়, কিন্তু কিছু বলেন না।
কারণ কথা বললে হয়তো নিজের ক্ষতি হবে।
এই মানুষগুলো খারাপ নন।
তারা শুধু ভীত, ক্লান্ত, অনিশ্চিত।
কিন্তু ইসলাম এই জায়গায় খুব নরমভাবে, কিন্তু স্পষ্টভাবে প্রশ্ন তোলে—
আমরা কি শুধু দর্শক হয়ে থাকার জন্য সৃষ্টি হয়েছি?
ইসলাম নীরবতা ভাঙতে বলে, কিন্তু ভদ্রভাবে
ইসলাম কখনো মানুষকে চিৎকার করতে শেখায় না।
কিন্তু ইসলাম মানুষকে দায়িত্ব এড়াতে দেয় না।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
“তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অন্যায় দেখে, সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিরোধ করে। যদি না পারে, মুখ দিয়ে। তাও যদি না পারে, অন্তরে ঘৃণা করে—আর এটি ঈমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর।”
এই হাদিসে একটি গভীর মানবিকতা আছে।
এখানে জোর নেই, চাপ নেই।
ইসলাম স্বীকার করে—
সবাই সবসময় শক্ত অবস্থানে থাকে না।
সবাই সবসময় মুখ খুলতে পারে না।
কিন্তু ইসলাম এটাও বলে—
অন্যায়কে স্বাভাবিক মনে করা বিপজ্জনক।
সাধারণ মানুষের নীরব কষ্ট
আমাদের সমাজে অনেক মানুষ মনে মনে কাঁদে।
তারা অন্যায়ের শিকার হয়,
আবার অন্যায় দেখেও চুপ থাকে।
একজন মা জানেন—
ছেলের সামনে অন্যায় মেনে নেওয়ার দৃশ্যগুলো
তার চরিত্রে প্রভাব ফেলছে।
একজন বাবা বোঝেন—
সত্য কথা বললে ক্ষতি হতে পারে,
তবু মিথ্যার সাথে আপস করতেও ভালো লাগে না।
এই দ্বন্দ্বগুলো খুব নীরব।
এগুলো পোস্টারে লেখা হয় না,
স্লোগানেও আসে না।
কিন্তু সমাজ বদলের গল্প শুরু হয় এখান থেকেই।
দায়িত্বশীল নাগরিক মানে হিরো হওয়া নয়
দায়িত্বশীল নাগরিক মানে সব সময় সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করা নয়।
মানুষের ধারণায় দায়িত্বশীল মানে হয়তো বড় কিছু করা।
কিন্তু বাস্তবে দায়িত্বশীলতা অনেক সময় খুব সাধারণ।
- নিয়ম মেনে চলা, কেউ দেখুক বা না দেখুক
- নিজের কাজটা ঠিকভাবে করা
- অন্যায় কাজে অংশ না নেওয়া
- দুর্বলকে ছোট না করা
- মিথ্যা সুবিধা না নেওয়া
এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলোই
একটি সমাজের নৈতিক মানচিত্র তৈরি করে।
ইসলাম এটাকেই বলে আমানতদারি—
নিজের অবস্থানকে দায়িত্ব হিসেবে দেখা।
আশা এখানেই
আমরা যদি ভাবি—
“সব কিছু তো খারাপ হয়ে গেছে”—
তাহলে দায়িত্বশীল হওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলি।
কিন্তু ইসলাম হতাশাকে সমর্থন করে না।
আল্লাহ বলেন—
“আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।”
এই আয়াত শুধু ব্যক্তিগত জীবনের জন্য নয়।
এটি সমাজের জন্যও।
যদি কিছু মানুষ নীরব দর্শক না থেকে
নিজের জায়গা থেকে দায়িত্ব নিতে শুরু করে,
তাহলে পরিবর্তন আসবেই।
ধীরে, কিন্তু স্থায়ীভাবে।
আত্মসমালোচনার জায়গা
এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে দোষ দেওয়া নয়।
আমরা সবাই কোনো না কোনো সময় নীরব থেকেছি।
প্রশ্নটা হলো—
আমরা কি সেই নীরবতাকে স্বাভাবিক করে নিচ্ছি?
আমি কি অন্যায় দেখেও শুধু বলছি—
“আমার কী?”
এই প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর।
কিন্তু এগুলোই আমাদের জাগিয়ে তোলে।
ইসলাম আমাদের আগে নিজেকে প্রশ্ন করতে শেখায়,
তারপর অন্যকে।
ভয়ের জায়গাটাও বাস্তব
দায়িত্বশীল হওয়া মানে সব ভয় কাটিয়ে ওঠা নয়।
ভয় থাকবেই।
কিন্তু দায়িত্বশীল নাগরিক সেই ব্যক্তি,
যে ভয় থাকা সত্ত্বেও
নিজের বিবেককে একেবারে চুপ করিয়ে দেয় না।
কখনো একটি নরম কথা,
কখনো একটি না বলা,
কখনো একটি সরে দাঁড়ানো—
এগুলোও দায়িত্বের অংশ।
নরম আহ্বান
এই লেখাটি কোনো ঘোষণা নয়।
এটি একটি নরম আহ্বান।
আমরা কি একটু সচেতন হতে পারি?
নিজের ছোট সিদ্ধান্তগুলোকে গুরুত্ব দিতে পারি?
নীরব দর্শক হয়ে থাকা সহজ।
দায়িত্বশীল হওয়া কঠিন।
কিন্তু সমাজ বদলায় সহজ পথ দিয়ে নয়।
শেষ কথা
হয়তো আপনি এই লেখার কোথাও থেমে গেছেন।
নিজের কোনো অভিজ্ঞতার সাথে মিল পেয়েছেন।
এই মিল খুঁজে পাওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়া
একটি হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়—
এটি ধীরে গড়ে ওঠা একটি মানসিক অবস্থান।
ইসলাম এই অবস্থানকে সম্মান করে।
কারণ এখান থেকেই শুরু হয়
একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক সমাজ।
নীরব দর্শক না হয়ে,
ধীরে ধীরে দায়িত্ব নেওয়ার সাহস—
এটাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজ।