আমরা প্রায়ই বলি—দেশ ভালো নেই।
সমাজ ভেঙে পড়ছে।
নৈতিকতা নেই, দায়িত্ববোধ নেই, মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করে না।
কথাগুলো মিথ্যা নয়। কিন্তু একা সত্যও নয়।
কারণ এই সমাজ, এই রাষ্ট্র—আমাদের বাইরের কোনো সত্তা নয়।
এই রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে আমাদের দিয়েই—আমার, আপনার, আমাদের সবার ছোট ছোট আচরণ, সিদ্ধান্ত, আপস আর নীরবতার ভেতর দিয়ে।
ইসলাম এখানে খুব কঠিন কিছু বলে না।
ইসলাম চিৎকার করে না।
ইসলাম আঙুল তুলে দোষারোপও করে না।
ইসলাম ধীরে বলে—
“তুমি নিজের দিকে একবার তাকাও।”
রাষ্ট্র কি আলাদা কিছু?
রাষ্ট্র মানে আমরা অনেক সময় শুধু সরকার বুঝি।
মন্ত্রী, আমলা, পুলিশ, আদালত—এই কাঠামোই যেন রাষ্ট্র।
কিন্তু বাস্তব জীবনে রাষ্ট্র শুরু হয় আরও আগে—
বাসার দরজার ভেতর থেকে।
যে বাবা সন্তানের সামনে মিথ্যা বলেন,
যে মা অন্যকে ছোট করে কথা বলেন,
যে শিক্ষক নিজের দায়িত্ব ফাঁকি দেন,
যে দোকানদার ওজনে কম দেন,
যে তরুণ “সবাই করে” বলে অন্যায় মেনে নেন—
এই ছোট ছোট কাজগুলো দিয়েই রাষ্ট্রের চরিত্র তৈরি হয়।
ইসলাম রাষ্ট্রকে কখনো আলাদা কোনো দানব হিসেবে দেখায় না।
কুরআন খুব স্পষ্ট করে বলে—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থাকে পরিবর্তন করে।”
(সূরা রা‘দ: ১১)
এটা কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়।
এটা একটি গভীর মানবিক সত্য।
আমরা ভালো মানুষ, কিন্তু ভালো নাগরিক কি?
আমাদের অনেকেই নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, দোয়া করি।
আল্লাহর উপর বিশ্বাস আছে—এতে সন্দেহ নেই।
কিন্তু প্রশ্নটা এখানে আসে—
এই বিশ্বাস কি আমাদের আচরণে প্রতিফলিত হয়?
রাস্তার পাশে আবর্জনা ফেললে,
লাইন ভেঙে আগে যেতে চাইলে,
ক্ষমতা পেলে দুর্বলকে চাপা দিলে,
নিজের ভুল ঢাকতে মিথ্যার আশ্রয় নিলে—
তখন আমাদের ঈমান কোথায় থাকে?
ইসলাম কখনো শুধু ইবাদতের ধর্ম নয়।
ইসলাম হলো চরিত্র গঠনের ধর্ম।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যার চরিত্র উত্তম।”
চরিত্র মানে শুধু ঘরে ভালো থাকা নয়।
চরিত্র মানে সমাজে কেমন মানুষ আমি।
নীরব কষ্টের সমাজ
আমাদের সমাজে অনেক মানুষ চুপচাপ কষ্টে থাকে।
কেউ কথা বলে না, অভিযোগ করে না—
শুধু ভেতরে ভেতরে ভাঙে।
একজন শ্রমিক জানে তার ন্যায্য মজুরি পাওয়া কঠিন।
একজন মা জানেন, স্কুলে ভর্তি করাতে ঘুষ লাগবে।
একজন তরুণ জানে, যোগ্যতা থাকলেও পরিচয় না থাকলে সুযোগ মিলবে না।
এই নীরব কষ্টগুলো রাষ্ট্রের রিপোর্টে আসে না।
কিন্তু আল্লাহর কাছে গোপন থাকে না।
ইসলাম এই জায়গায় খুব সংবেদনশীল।
কারণ ইসলামের রাষ্ট্রচিন্তা শুরু হয় ইনসাফ থেকে।
রাসূল ﷺ বলেছেন—
“একটি জাতি কুফর নিয়ে টিকে থাকতে পারে, কিন্তু জুলুম নিয়ে নয়।”
এটা গভীর কথা।
ইমানহীন রাষ্ট্রও টিকে গেছে ইতিহাসে,
কিন্তু অবিচারী রাষ্ট্র ভেঙে পড়েছে—বারবার।
পরিবর্তন কি খুব বড় কিছু দিয়ে শুরু হয়?
আমরা ভাবি—
সব ঠিক করতে হলে আগে সরকার ঠিক হতে হবে, আইন বদলাতে হবে, বড় সংস্কার লাগবে।
ইসলাম বলে—
না, শুরুটা আরও ছোট।
শুরুটা আমি কীভাবে কথা বলি,
আমি দায়িত্বে অবহেলা করি কি না,
আমি দুর্বলকে সম্মান দিই কি না,
আমি সুযোগ পেলে অন্যায় করি কি না।
হযরত উমর (রা.) রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন।
কিন্তু তিনি রাতের অন্ধকারে একা বেরিয়ে দেখতেন—মানুষ কেমন আছে।
এটা ক্ষমতার প্রদর্শন নয়।
এটা দায়িত্ববোধ।
আজ আমাদের কতজন নিজের অবস্থান থেকে এভাবে ভাবি?
সুনাগরিক: ইসলাম যাকে চায়
ইসলামের চোখে সুনাগরিক সেই ব্যক্তি—
- যে আল্লাহকে ভয় করে, কিন্তু মানুষকে ভয় পেয়ে অন্যায় করে না
- যে নিজে কষ্ট পায়, তবু অন্যায় করে সুবিধা নেয় না
- যে ভুল করলে স্বীকার করতে পারে
- যে দায়িত্বকে আমানত মনে করে
- যে সমাজকে নিজের ঘরের মতো দেখে
এটা কোনো আদর্শবাদী কল্পনা নয়।
এটা বাস্তব, সম্ভব, কিন্তু কঠিন পথ।
কারণ এখানে সবচেয়ে কঠিন কাজটি করতে হয়—
নিজেকে বদলানো।
নরম আহ্বান, দৃঢ় সিদ্ধান্ত
এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে দোষী করা নয়।
আমরা সবাই কমবেশি এই ব্যর্থতার অংশ।
কিন্তু ইসলাম আমাদের আশার জায়গাটাও দেখায়।
আল্লাহ বলেন—
“হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা কর।”
রাষ্ট্র সংস্কার এখানে শেষ কথা নয়।
প্রথম কথা—নিজেকে, নিজের পরিবারকে, নিজের আচরণকে ঠিক করা।
হয়তো আমি একা সব বদলাতে পারব না।
কিন্তু আমি নিজের অংশটুকু বদলাতে পারি।
আর এখান থেকেই শুরু হয়
সুনাগরিক গড়ার ইসলামি দর্শন।
চুপচাপ, নাটক ছাড়াই,
নিজের ভেতর থেকে।
শেষ কথা
আপনি যখন এই লেখা পড়ছেন,
হয়তো কোথাও নিজের সাথে মিল খুঁজে পাচ্ছেন।
এই নাড়া লাগাটাই যথেষ্ট।
কারণ ইসলাম বিপ্লব শুরু করে না রাস্তায়—
ইসলাম বিপ্লব শুরু করে মানুষের অন্তরে।
সেখান থেকেই রাষ্ট্র বদলায়।